ডুমুরিয়া উপজেলায় লাইসেন্সবিহীন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যপণ্য উৎপাদনের উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। মাছি-পোকামাকড়ে ভরা, স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন কারখানায় তৈরি হচ্ছে বিস্কুট, রুটি, নানরুটি, কেক, ক্রিম রোলসহ নানা খাদ্যসামগ্রী। এসব পণ্য প্রতিদিন উপজেলা সদর, খর্ণিয়া, চুকনগর, আঠারোমাইল, শাহপুর, মিকশিমিল, ধামালিয়া, বরুনা বাজার, আমভিটা, খলসীর মোড়সহ আশপাশের বাজার ও চায়ের দোকানগুলোতে সরবরাহ করা হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নেই বৈধ লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকিতেও রয়েছে নানা প্রশ্ন! ফলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বেকারি ও খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগেই স্বাস্থ্যবিধির ন্যূনতম মানদণ্ড মানা হচ্ছে না। উৎপাদন কক্ষে উড়ছে মাছি, মেঝে স্যাঁতসেঁতে, কোথাও কোথাও পোকামাকড়ের উপদ্রব। খাদ্য উৎপাদনের পরিবেশ এতটাই নাজুক যে সেখানে তৈরি খাবারের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, খরসংঘ গ্রামের গাজী ফুড প্রোডাক্টস ২০১৫ সালে বিএসটিআই থেকে বিস্কুট উৎপাদনের লাইসেন্স পেলেও সেটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৮ সালের ৩০ জুন। এরপর আর লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের পাশাপাশি গবাদিপশুর বর্জ্যের দুর্গন্ধও পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, মিকশিমিল বাজারের সাদিয়া ফুড প্রোডাক্টস-এর বিরুদ্ধে উৎপাদনের তারিখ উল্লেখ ছাড়াই খাদ্যপণ্য বাজারজাত করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের কাঁচামাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে এসব পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে শিমুল ফুড প্রোডাক্টস, মায়ের দোয়া বেকারি, আম্মাজান বেকারি, বিসমিল্লাহ বেকারি ও সাহা বেকারিসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আব্দুলিয়া গ্রামে বাড়ির ভেতরেই মোরশেদ ও খোরশেদ নামে দুই ভাই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টি সিঙ্গারাসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্য তৈরি করে বাজারজাত করছেন। এসব খাদ্যসামগ্রী জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে বলে দাবি এলাকাবাসীর।
মিকশিমিল বাজারের এক চা-দোকানি বলেন, “কয়েকটি স্থানীয় বেকারিতে খুবই নিম্নমানের খাবার তৈরি হয়। দাম কম হওয়ায় দোকানিরা কিনে বিক্রি করেন, কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”
ডুমুরিয়া বাজারের ব্যবসায়ী মোহন খান বলেন, “চায়ের দোকানগুলোতে এখন এসব নিম্নমানের খাদ্যপণ্যের বিক্রি বেড়েছে। সাধারণ মানুষ না জেনেই স্বাস্থ্যঝুঁকি পূর্ণ খাবার খাচ্ছেন। এগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক মোল্যা মোশাররফ হোসেন মফিজ বলেন, “অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থার কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে পরিদর্শনে গেলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম চলেই যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হলেও তাতে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি।
উপজেলা স্যানিটারি কর্মকর্তা সুকেন্দ্র কুমার ঘোষ বলেন, “কয়েকটি বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তাদের একাধিকবার পরিবেশ উন্নত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা মাহমুদ বলেন, “অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডুমুরিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অমিত কুমার বিশ্বাস বলেন, “অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের অভিযোগ পেয়েছি। খুব শিগ্গিরই অভিযান পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
খুলনা গেজেট/এনএম

